মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১২

বুনো কাঁঠাল


বুনো কাঁঠাল
বুনো কাঁঠাল
ছবি: লেখক
আভিধানিক নাম ‘অচ’, ‘বনাচ’ বা ‘বড়চাঁদ’। জন্মে প্রাকৃতিক বনে এবং ফল দেখতে খানিকটা কাঁঠালের মতো। এ জন্য লোকজন বলে ‘বুনো কাঁঠাল’। বুনো কাঁঠাল খাওয়া যায় না, তবে এর ফল ও পাতার ভেষজ গুণাবলি আছে।
দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে জোয়ার-ভাটাবিধৌত খাল ও নদীতীর এলাকায় বুনো কাঁঠালগাছ দেখা যায়। লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে বলে সুন্দরবন এলাকায় এর আধিক্য বেশি। তবে সমতল পলল ভূমিতেও ভালো হয়। পাশাপাশি জলাভূমি, পুকুরপাড় ও রাস্তার পাশেও জন্মে এ গাছ।
দেশের বাইরে শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, চীন ও অস্ট্রেলিয়ায়ও বুনো কাঁঠালগাছ জন্মাতে দেখা যায়।
বুনো কাঁঠাল জেনটিয়ানালেস (Gentianales) বর্গের দ্বিবীজপত্রী আবৃতবীজী উদ্ভিদ। উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয়ে Morinda citrifolia এবং রুবিয়েসি (Rubiaceae) পরিবারের সদস্য। এই পরিবারকে কফি পরিবার নামে আখ্যায়িত করা হয়। এই উদ্ভিদ পরিবারের ৪৫০টি গণের অন্তর্গত প্রায় ৬৫০০টি প্রজাতির অস্তিত্ব রয়েছে। এই পরিবারের অন্যান্য বেশ পরিচিত উদ্ভিদের মধ্যে আছে কদম, কেলিকদম, রঙ্গন, ভুইপাট, কফি ও গন্ধরাজ।
বুনো কাঁঠাল মাঝারি ধরনের সবুজ বৃক্ষ। উদ্ভিদের বাহ্যিক অবয়ব লক্ষ করলে দেখা যায়, কাণ্ড মসৃণ ও তামাটে বর্ণের। কাণ্ডের মাথার দিক নরম ও চারকোনাকার। উদ্ভিদের পত্র উপপত্রযুক্ত, বৃন্তক ও পত্রবৃন্ত খাটো। পত্রফলক উপবৃত্তাকার, পুরু, রসাল; অনেকটা কদমপাতার সদৃশ। পত্র শিরা বেশ স্ফীত ও স্পষ্ট। ফুলের পুংদণ্ড খাটো ও রোমশ, পরাগধানী আয়তাকার থেকে ডিম্বাকার। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ফুল ধরে এবং কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ফল পাকে।
বুনো কাঁঠালের ফুল সহবাসী। বকের মতো সাদা সাদা ফুল বুনো পরিবেশে সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। ছোট আকারের যৌগিক রসাল ফলকে উদ্ভিদবিদ্যার ভাষায় বেরি ফল বলে। মাংসল ফল ডালে ডালে থোকার মতো ধরে। ফল দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো। কাঁচা অবস্থায় হালকা সবুজ এবং পাকলে হালকা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। ফলে অনেক বীচি থাকে, শরিফা বা কাঁঠালের মতো বিন্যস্ত থাকে।
বুনো কাঁঠাল মানুষের আহারযোগ্য নয়। কিন্তু বনের পশুপাখি এই ফল খায়। বুনো কাঁঠালের পাতার রস বলকারক এবং ডায়রিয়া, আমাশয় ও আলসার নিরাময়ক বলে জনশ্রুতি আছে। কাঁচা ফল রক্তক্ষরণ রোধ করে বলে দাবি করেছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার স্থানীয় কয়েকজন। কাঠের কদর আছে আসবাব, খুঁটি ও কৃষি যন্ত্রপাতির বাঁট ইত্যাদি তৈরির কাজে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের পক্ষ থেকে ২০১০ সালে দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলের ৩০০ বসতবাড়িতে একটি জরিপ চালানো হয়। এতে মাত্র একটি বুনো কাঁঠালগাছের খোঁজ মেলে। পরবর্তী সময়ে বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার সমতল ভূমির বসতবাড়িতে একটি এবং পটুয়াখালীর মহিষকাটা বাজারে আরেকটি গাছ শনাক্ত করা হয়েছে।
এ প্রজাতিটি জার্মপ্লাজম বন গবেষণাকেন্দ্রের জিনব্যাংকে সংরক্ষণ করা দরকার। এ ছাড়া ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রে এ গাছ লাগানো যেতে পারে। বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির নার্সারিগুলো পরীক্ষামূলক এর চারা তৈরির চেষ্টা করতে পারে।prothom-alo
[ ... ]

বুধবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১১

রাতে ফুল ফোটা প্রথম অর্কিড!

বি. নকটার্নাম বি. নকটার্নাম
শুধু রাতেই ফুল ফোটে, এমন এক অর্কিডের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন একদল উদ্ভিদবিজ্ঞানী। বিজ্ঞানীদের জানামতে, ২৫ হাজারের মতো পরিচিত অর্কিড প্রজাতির মধ্যে রাতে ফুল ফোটা জাতের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। প্রজাতিটির ব্যতিক্রমী এই আচরণের কারণ এখনো জানা যায়নি।
পাপুয়া নিউগিনির কাছে নিউ ব্রিটেন নামের একটি দ্বীপে নেদারল্যান্ডের এক গবেষক অর্কিডের এ নতুন প্রজাতির সন্ধান পান।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনসের (কিউ গার্ডেন) অর্কিড বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু সুইটম্যান বলেন, এটা খুবই অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার। কেননা, অর্কিডের বহু প্রজাতি রয়েছে। কিন্তু এর কোনোটাই রাতে ফোটে না। তিনি আরও বলেন, অর্কিড নিয়ে এত বছরের গবেষণার পর রাতে ফোটে, এমন প্রজাতি খুঁজে পাওয়াটা সত্যিই ‘অসাধারণ’।
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দ্বীপ নিউ ব্রিটেনে মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালানোর সময় ডাচ গবেষক ইড ডি ভোগেল নতুন এই অর্কিডের সন্ধান পান। তবে তিনি চারাটি দেশে নিয়ে আসার পরই কেবল এটির ফুল রাতে ফোটার বিষয়টি ধরা পড়ে।
এই অর্কিডের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর ফুল ফুটে কেবল এক রাতই স্থায়ী থাকে। এর নাম দেওয়া হয়েছে বি. নকটার্নাম।
নতুন অর্কিডটি বালবোফিলাম গণের একটি প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই গণে প্রায় দুই হাজার প্রজাতি রয়েছে, যা অর্কিড-পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
গবেষকেরা বলেন, এমন অনেক প্রজাতির অর্কিড রয়েছে, যেগুলো নিশাচর কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে রাতে পরাগায়ন ঘটায়। কিন্তু রাতে ফুল ফোটে একমাত্র এই বি. নকটার্নামেরই।
সুইটম্যান বলেন, মাঠপর্যায়ের গবেষণা না করা পর্যন্ত বি. নকটার্নাম কেন রাতে ফোটে, সে রহস্য উদ্ঘাটন করা যাবে না। বিবিসি।
[ ... ]

সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১১

জাফরান ভেবে দইগোটা!

দইগোটা, দইগোটা ফুল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বোটানিক্যাল গার্ডেনে জাফরান ফুল। দইগোটা, দইগোটা ফুল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বোটানিক্যাল গার্ডেনে জাফরান ফুল।
ছবি: লেখক
অনেক সময় নার্সারিতে দেখে ভালো লাগার চারাটি কিনে ফেলা হয়, এর পরিচয় না জেনেই। বিদেশি গাছের বেলায় তো প্রায়ই এমন ঘটে। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, প্রকৃত নামের পরিবর্তে গাছটিকে যে নামে ডাকা হয়, সেই নামের গাছের সঙ্গে প্রকৃত গাছটির কোনো ধরনের সাদৃশ্য বা সম্পর্ক থাকে না।
এমন একটি গাছের নাম দইগোটা।একে আবার লটকনও বলে অনেকে। এই রঞ্জক উদ্ভিদটি এখানে ভুল করে জাফরান ভাবা হয়। কিন্তু আকার-আকৃতিতে গাছ দুটি একেবারেই আলাদা। আদতে জাফরান বেশ দুষপ্রাপ্য এবং নামীদামি সুগন্ধি। জানামতে, দেশে এখন পর্যন্ত জাফরান চাষের কোনো রেকর্ড নেই। বর্ষজীবী এই কন্দজ গাছ সাধারণত শীতের দেশেই জন্মে। সেখানকার পরিকল্পিত বাগানগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে দেখেছি।
ঢাকার কোনো পার্কে বেড়াতে গেলে দইগোটার গাছ দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে। কারণ, চোখে পড়ার মতো তেমন আকর্ষণীয় কিছুই থাকে না প্রায় সারা বছর। শুধু চিরুনির ফলার মতো খোলসওয়ালা লালচে রঙের কতগুলো ফল চোখে পড়ে গাছে। তা-ও আবার উপাদেয় কোনো ফল নয় বলে মানুষের উৎসাহ খানিকটা কম। তবে বর্ষার শেষভাগ থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ঈষৎ গোলাপি রঙের ফুলগুলো ফুটতে থাকে।
লটকন বা দইগোটা (Bixa orellana) সারা দেশে রঞ্জক হিসেবেই চাষ হয়। কিন্তু দেশি ফল লটকা বা লটকনের সঙ্গেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। ধারণা করা হয়, বীজের রং দই রাঙানোর কাজে বেশি ব্যবহূত হতো বলেই এমন নামকরণ। প্রাচীনকালে মানুষ যে কয়েকটি গাছ থেকে প্রাকৃতিক রং সংগ্রহ করত, দইগোটা তার মধ্যে অন্যতম। রঞ্জক উদ্ভিদ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়েই প্রথমে এ গাছ সম্পর্কে জানতে পারি। ঢাকায় রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ কারও কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহেও দেখা যায়।
এটি ক্রান্তীয় আমেরিকার প্রজাতি। সতেরো শতাব্দীর দিকে স্প্যানিশদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। গাছ ছোট, ঝোপাল, চার থেকে পাঁচ মিটার উঁচু ও চিরসবুজ। পাতা বড়। ফুল ফোটে শরৎ থেকে শীতের প্রথমভাগ অবধি। ফুল একসঙ্গে অল্প কয়েকটি ফোটে। দেখতে গোলাপি, ঈষৎ বেগুনি বা সাদাটে। পাপড়ির মাঝখানে হলুদ-সোনালি রঙের একগুচ্ছ পুংকেশর থাকে। ফল লালচে বাদামি, নরম কাঁটায় ভরা। বীজ লাল শাঁসে জড়ানো। এই বীজ থেকেই পাওয়া যায় রং।
এবার জাফরান প্রসঙ্গ। এরা পেঁয়াজের মতো পাতা ও কাণ্ডবিশিষ্ট বহুবর্ষজীবী গুল্ম। মাটির নিচে মূলে কন্দ ও অনেক শিকড় থাকে। অন্য নাম কুমকুম বা কুঙ্কুম। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে এই গণের ৬০টি প্রজাতি রয়েছে। জাফরান (Crocus sativus) স্বাদে তেতো, ঝাঁজালো, পিচ্ছিল ও সুগন্ধময়। দামি রান্নায় ও সুগন্ধের জন্য পরিমাণমতো ব্যবহার করা হয়। ভালো জাফরান রক্তাভ-পীত রঙের এবং পদ্মগন্ধযুক্ত। প্রাচীনকাল থেকেই কাশ্মীরে এ ধরনের উৎকৃষ্ট মানের জাফরান জন্মে। তা ছাড়া ইরান, ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনেও এর ব্যাপক চাষ হয়।
খাদ্যদ্রব্য ছাড়াও দামি প্রসাধন সামগ্রী হিসেবে জাফরান ব্যবহার্য। প্রাচীনকালে জাফরান গায়ে মাখা হতো শরীরের সৌষ্ঠব বাড়ানোর জন্য। ত্বক এর গুণে লাবণ্যময় হয়ে ওঠে। এ ছাড়া নানা রোগেও জাফরানের বহুমাত্রিক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। চড়া মূল্যের কারণে ইদানীং জাফরানের ব্যবহার অনেক কমেছে।
এবার নিশ্চয়ই আর জাফরান ভেবে অন্য কোনো গাছ নিয়ে বাড়ি ফিরবেন না।
[ ... ]

শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১১

হেমন্তের দেবকাঞ্চন

রমনা উদ্যানে হেমন্তে ফুটেছে দেবকাঞ্চন রমনা উদ্যানে হেমন্তে ফুটেছে দেবকাঞ্চন
ছবি: হাসান রাজা
কাঞ্চন ফুলের নাম করলে বসন্তের রক্তিম ফুলটির কথাই সচরাচর মনে পড়ে। তাকে নিয়ে কবিতাও আছে—ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল/ ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল’। তবে এখন রমনা উদ্যানে যে কাঞ্চন ফুটেছে, সেটি বসন্তের নয়, হেমন্তের। বর্ণেও আকাশ-পাতাল তফাত উভয়ের।
বসন্তের কাঞ্চনের নাম রক্তকাঞ্চন। নাম থেকেই অনুমান করা যায় তার রং কেমন। শীতের শেষে রক্তকাঞ্চনের পাতা ঝরে যায়। এর পাতাগুলোও চমৎকার। ডগার দিকটি দ্বিধাবিভক্ত। পাতাবিহীন বা অল্প কতক পাতাকে ছাপিয়ে শাখাগুলো ভরে ওঠে গাঢ় বেগুনি রঙের ফুলে ফুলে। ফোটেও প্রচুর।
হেমন্তের কাঞ্চন শ্বেত-শুভ্র বর্ণ। এর নাম দেবকাঞ্চন। বৈজ্ঞানিক নাম Bauhinia purpurea। উভয় প্রকারের কাঞ্চনই ভারতের নিজস্ব উদ্ভিদ। তবে হিমালয়ের পাদদেশ ও আসাম দেবকাঞ্চনের আদি নিবাস। বাংলাদেশে উভয় ধরনের কাঞ্চনেরই বংশবিস্তার বহুকাল থেকে।
দেবকাঞ্চন মাঝারি আকারের গাছ। উচ্চতা গড়পড়তা ৮-১০ মিটার। এর পাতা রক্তকাঞ্চনের চেয়ে আকারে একটু বড়, গাছটিও। ফুল ছয় থেকে আট সেন্টিমিটার চওড়া, পাপড়ির সংখ্যা পাঁচটি। ঠিক গুচ্ছ আকারে নয়, তবে একটি ডাঁটায় কয়েকটি করে ফুল ফোটে। ফুলে মিষ্টি সৌরভ। সেই সৌরভে মুগ্ধ হয়ে কীটপতঙ্গ উড়ে আসে। তাতেই পরাগায়ণ। হেমন্তের মাঝ নাগাদ শাখা ফুলে ভরে ওঠে। এ সময় পাতাও থাকে অল্প। তখন খুবই চমৎকার দেখায় গাছগুলো।
রমনা উদ্যানের দক্ষিণ পাশে ‘কিছুক্ষণ’ চত্বরের সমানে আছে দেবকাঞ্চনের সারি। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের হাইকোর্ট-সংলগ্ন প্রাচীরের পাশেও লম্বা সারি আছে দেবকাঞ্চনের। গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচার বিভাগের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক নিসর্গ অনুরাগী জিয়াউল হাসান (পাখি ভাই) জানালেন, শরতের শেষ দিক থেকেই রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দেবকাঞ্চন ফুটতে শুরু করেছে। শীতের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফুল থাকে। ফুল ফোটা শেষ হলে শিমের মতো আকৃতির ফল ধরে। ভেতরে বীজ থাকে ১২ থেকে ১৬টি। বীজ থেকে সহজেই এর চারা উৎপন্ন করা যায়।
হেমন্তের ফুলের বাহার তেমন পর্যাপ্ত নয়। শিউলীর প্রস্ফুটন অব্যাহত থাকলেও শরতের ফুল বলেই এর পরিচিতি। কুয়াশার চাদর জড়ানো হেমন্তে শিশিরভেজা দেবকাঞ্চনের শোভা চোখজুড়ানো।
[ ... ]

বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১১

প্রাকৃতিক ভেষজ অনন্তমূল



অনন্তমূল হচ্ছে লতা জাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক নাম: Hemidesmus indicus (Linn) R.Br. . ইউনানী নামঃ  ওশবা (দেশী)। অনন্তমূলের ঔষধিগুণ ব্যাপক। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাক্ষেত্রে এ উদ্ভিদটি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে যে কোন স্থানে অনন্তমূল গাছ পাওয়া যায়। বাড়ীর আঙিনা, পতিত ভূমি, ঝোঁপঝাড়ে অনন্তমূল গাছ পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক ভাবে জন্মায়।
অনন্তমূল গাছের ধরণঃ এটি একটি লতা জাতীয় উদ্ভিদ। কোন কিছুর উপর ভর করে কিংবা অন্য গাছকে অবলম্বন করে পেচিয়ে থাকে। মূল অনেক লম্বা হয়। এবং মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে বলে এর নাম হয়েছে অনন্তমূল। পাতা সরল, সরু ও লম্বা, দেখতে কালচে সবুজ। পাতার মাঝখানে শিরা বরাবর সাদা দাগ থাকে। পাতা ও লতার যেকোন অংশ ছিড়লেই সাদা রঙের কষ বের হয়।
অনন্তমূলে পাতা সহ গাছের সমস্ত অংশই মানব দেহের জন্য উপকারী।
খোস পাচড়াঃ অনন্ত মূল গাছের মূল ১-৩ গ্রাম পিষে প্রত্যেক দিন আহারের পর ২ বার আক্রান্ত স্থানে প্রলেপ দিতে হবে।
প্রদাহ, ব্রণঃ অনন্তমূল গাছের মূল ১-৩ গ্রাম বেটে কুসুম গরম পানি মিশিয়ে আক্রান্ত স্থানে লাগাতে হবে।
খাদ্যে অরুচিঃ অনন্তমূল গাছের পাতা সহ গাছের রস ১০-১৫ মিলি বের করে অল্প পানি দিয়ে খেতে হবে অথবা থেতো করে রাতে গরম পানিতে ভিজিয়ে রেখে রস সকালে খালি পেটে খেতে হবে। তবে ঔষধ সেবন করার কিছুক্ষণ পর নাস্তা খেতে হবে।
হাত-পা জ্বালাঃ গাছের সমস্ত অংশ ৩-৫ গ্রাম পিষে রস করে পানি সহ অল্প চিনি মিশিয়ে প্রত্যক দিন ২ বার খেতে হবে।
রক্ত পরিষ্কারের জন্যও কবিরাজরা অনন্তমূলের নির্যাস ব্যবহার করে থাকেন। এ ছাড়া যৌনব্যাধি নিরাময়েও অনন্তমূলের ব্যবহার রয়েছে। শিশুদের বৃক্ক প্রদাহ নিরাময়ে গ্রাম্য কবিরাজরা সাধারণত এ উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন।
[ ... ]

প্রাকৃতিক ভেষজ ঘৃতকুমারী

ঘৃতকুমারী একটি ভেষজ উদ্ভিদ। ঘৃতকুমারী পাতার রস যকৃতের জন্য উপকারী।বাংলায় নাম তরুণী ঔষধি গাছ হিসারে এর অনেক কদর। তবে বাংলার মানুষ একে ঘৃতকুমারী নামেই বেশী চিনে। এর আর একটি নাম আছে তা হলো কুমারী । এর বৈজ্ঞানিক নাম Aloe vera এটি Asphodelaceae (Aloe family) পরিবারের একটি উদ্ভিদ। অন্যান্য নামের মধ্যে Aloe vera, Medicinal aloe, Burn plant Hindi: Gheekumari উল্লেখযোগ্য।
ঘৃতকুমারী বহুজীবি ভেষজ উদ্ভিদ এবং দেখতে অনেকটা আনারস গাছের মত। এর পাতাগুলি পুরু, দুধারে করাতের মত কাঁটা এবং ভেতরে লালার মত পিচ্ছিল শাঁস থাকে। সবরকম জমিতেই ঘৃতকুমারী চাষ সম্ভব তবে দোঁয়াস ও অল্প বালি মিশ্রিত মাটিতে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় নিয়মিত জলসেচের দরকার হলেও গাছের গোড়ায় যাতে জল থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সাধারণতঃ শেকড় থেকে বেরনো ডাল বা ‘সাকার’-এর সাহায্যে এই গাছের বংশবৃদ্ধি হয়।
এই ঘৃতকুমারীতে রয়ছে ২০ রকমের খনিজ। মানবদেহের জন্য যে ২২টা এমিনো এসিড প্রয়োজন তার ৮ টি এতে বিদ্যমান। এছাড়াও ভিটামিন A, B1, B2, B6, B12, C এবং E রয়েছে।
ব্যবহার্য অংশ – পাতা, শাঁস
-ঘৃতকুমারী পাতার রস, ২-৪ চামচ করে দিনে একবার খেলে যকৃতের ক্রিয়া বৃদ্ধি করে৷
কোন জায়গা যদি আগুনে পুড়ে যায় তাহলে টাটকা পাতার শাঁস ঐ জায়গায় লাগলে চট্ জলদি আরাম পাওয়া যায়৷ ফলে ফোসকা পড়ে না এবং চামড়ার দাগ হয় না৷
-মাথা যদি সব সময় গরম থাকে তাহলে পাতার শাঁস প্রতিদিন একবার তালুতে নিয়ম করে লাগালে মাথা ঠান্ডা হয়৷
-একজিমা ঘৃতকুমারী শাঁস প্রতিদিন নিময়ম করে কয়েক সপ্তাহ লাগালে চুলকানি খেকে আরাম পাওয়া যায়৷
-কোমরে ব্যথা হলে শাঁস অল্প একটু গরম করে মালিশ করলে আরাম পাওয়া যায় ৷
-ঘৃতকুমারী শাঁস ১ – ২ চামচ ও ২ চামচ মিছরি একসঙ্গে সেবন করলে শরীরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়৷

ঘৃতকুমারী পাতার রস , শসা ও মধু
ঘৃতকুমারী পাতার রস বিষাক্ত উপাদানের প্রতি বিশেষ ভুমিকা পালন করতে পারে । এ জন্য চেহারা মেচেতার ওপর কিছু ঘৃতকুমারী পাতার রস রেখে দেয়, চেহারার ত্বকের নরম হবে এবং কিছু ক্ষতচিহ্ন দেখা যায় না । যদি আপনার মুখের মেচেতা খুব গুরুতর , তাহলে ঘৃতকুমারী পাতার রস পানির সঙ্গে মিশিয়ে খান, প্রতিদিন দু’বার ,প্রত্যেকবার ১০ মিলিলিটার ,কার্যকরভাবে মেচেতা প্রতিরোধ করা যায় ।
ঘৃতকুমারীর একটি পাতা, মধু এ একটি ছোট শসা ছোট করে মিশিয়ে করে মাস্ক করে এবং মেচেতার ওপর রেখে দেন, চামরার ফুস্কুড়িও প্রতিরোধ করতে পারে ।
উল্লেখ যে, নারীদের মুখে যদি মেচেতা থাকে, তাহলে মেক-আপ না করা ভালো । কারণ যেসব মেক-আপ ক্রিম ত্বকের সূক্ষ্মরন্ধ্রের স্বাভাবিক রূপান্তর বাধা দেবে এবং মুখের মেচেতা গুরুতর হবে ।
[ ... ]

প্রাকৃতিক ভেষজ কালিজিরা

কালোজিরার বৈজ্ঞানিক নামঃ Nigella Sativa Linn.- এটি মাঝারী জাতীয় মৌসুমী গাছ, একবার ফুল ও ফল হয় । স্ত্রী, পুরুষ দুই ধরণের ফুল হয়, রং সাধারণত হয় নীলচে সাদা (জাত বিশেষে হলুদাভ), পাঁচটি পাঁপড়ি বিশিষ্ট । কিনারায় একটা রাড়তি অংশ থাকে। তিন-কোনা আকৃতির কালো রং এর বীজ হয় । গোলাকার ফল হয় এবং প্রতিটি ফলে ২০-২৫ টি বীজ থাকে ।

আয়ুর্বেদীয় , ইউনানী, কবিরাজী ও লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। মশলা হিসাবে ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে, এটি পাঁচ ফোড়নের একটি উপাদান। বীজ থেকে পাওয়া তেল।
হুজুর পাক(সাঃ)বলেছেন, “একমাত্র মৃত্যু ছাড়া সকল রোগের ঔষুধ এই কালিজিরা’ – আল হাদিস
জেনে নেই এই কালিজিরার কিছু গুনাবলি :
প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষ খাবারের সঙ্গে ‘কালিজিরা’ গ্রহণ করে আসছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানতে পেরেছেন যে কালিজিরার সব গুণ লুকিয়ে আছে এর তেলে।
সাধারণত আমরা খাবারের সঙ্গে মসলা হিসেবে অথবা ভর্তা করে ভাতের সঙ্গে কালিজিরা খেয়ে থাকি। কিন্তু এভাবে আমাদের স্বাস্থ্য কালিজিরার আসল গুণাবলি থেকে বঞ্চিত হয়। তাই কালিজিরা নয়, বরং কালিজিরার তেল আমাদের শরীরের জন্য নানাভাবে উপকারী।
কালিজিরার তেলে ১০০টিরও বেশি উপযোগী উপাদান আছে। এতে আছে প্রায় ২১ শতাংশ আমিষ, ৩৮ শতাংশ শর্করা এবং ৩৫ শতাংশ ভেষজ তেল ও চর্বি। কালিজিরার অন্যতম উপাদানের মধ্যে আছে নাইজেলোন, থাইমোকিনোন ও স্থায়ী তেল। এতে আরও আছে আমিষ, শর্করা ও প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিডসহ নানা উপাদান। পাশাপাশি কালিজিরার তেলে আছে লিনোলিক এসিড, অলিক এসিড, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, জিংক, ম্যাগনেশিয়াম, সেলেনিয়াম, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-বি২, নিয়াসিন ও ভিটামিন-সি।
কালিজিরার বৈজ্ঞানিক নাম নাইজেলা সাতিভা। নাইজেলা সাতিভাকে আরবি ভাষায় বলা হয় হাব্বাত-উল-বারাকা (আশীর্বাদপুষ্ট বীজ) এবং ইংরেজিতে বলা হয় লাভ ইন দ্য মিস্ট।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করায় কালিজিরার অবদান অসামান্য এবং সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল জীবনে এর প্রভাব পড়ে আরও নানাভাবে। এটি দেহকে এর নিজস্ব প্রাকৃতিক নিয়মে সুস্থ করে তোলায় সহযোগিতা করে।
এই অতুলনীয় ভেষজের গুণাগুণ প্রায় কিংবদন্তির মতো এবং সম্প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোয় চিকিৎসায় এর গুরুত্ব আস্তে আস্তে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। প্রায় তিন হাজার বছর ধরে চলে আসা গল্পগাথায় যে কালিজিরার মহৌষধি গুণের কথা বলা হয়েছে, ৫০ বছরে সেই ভাষ্য অর্জন করেছে বৈজ্ঞানিকভাবে সম্মতি ও সম্মান।
শরীরের রোগ প্রতিরোধে কালিজিরার মতো এত সহজে এত কার্যকর আর কোনো প্রাকৃতিক উপাদান আছে বলে জানা যায়নি। উন্নত দেশগুলোয় বিভিন্ন কারণ, যেমন চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে মাটি তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি হারায়, তাই শস্যের গুণাগুণ ধ্বংস হয়ে যায়, আর মানুষ শিকার হয় সেলুলার ম্যালনিউট্রেশনের। রান্নার পদ্ধতির কারণে খাবারের খাদ্যগুণ অনেকাংশেই নষ্ট হয়। পাশাপাশি আছে পরিশোধিত খাবার গ্রহণ ও দূষিত পরিবেশের প্রভাব। এসব কারণের মিলিত ফলাফল খাবারের প্রয়োজনীয় রস ও পুষ্টির অভাব।
কালিজিরার তেলের উপকার
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, ইনসুলিন রোধ হ্রাস (এভাবে ডায়াবেটিস কমিয়ে রাখা), কাশি ও হাঁপানির উপশম, ্নৃতিশক্তি বৃদ্ধি, হৃজ্জনিত সমস্যার আশঙ্কা হ্রাস, চুল পড়া হ্রাস, ত্বকের সুস্বাস্থ্য, মায়ের দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি, আর্থÛাইটিস ও মাংসপেশির ব্যথা কমাতে কালিজিরার তেল উপযোগী। কালিজিরার তেল গর্ভাবস্থায় গ্রহণ করতে হয় না।
 
[ ... ]