বেশ কয়েক বছর আগে পানামা ও হন্ডুরাসে অনেক বাগান দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। বিশ্বব্যাংকের এক কৃষি মিশনের সদস্য হিসেবে গিয়েছিলাম পানামা ও হন্ডুরাসে কোকোয়া ও কফির উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনে। এই কোকোয়া ফলের বীজ থেকেই তৈরি হয় আমাদের অতি প্রিয় চকলেট। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, কোকোয়া ফল কলম্বাস ১৪৯৫ সালে মধ্য আমেরিকা থেকে ইউরোপে নিয়ে এসেছিলেন। তবে স্প্যানিশ জেনারেল কোরেটজ্ ১৫২০ সালের মাঝামাঝি এই স্বর্গীয় ফল স্পেনে আমদানি করেন। পরে ফরাসিরা এই গাছের সন্ধান পায়। ১৬৫৭ সালে এক ফরাসি নাগরিক লন্ডনে ‘চকলেট হাউস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমের চকলেট জনপ্রিয় করে তোলেন।
কোকোয়ার বৈজ্ঞানিক নাম Theobroma cacao। গ্রিক ভাষায় Theos মানে ভগবান আর broma মানে খাদ্য অর্থাত্ ভগবানের খাদ্য। এর পরিবারের নাম Sterculiaceae। গাছ বেশি বড় হয় না। বড়জোর ২৫ ফুট উঁচু হতে পারে। তবে কোকোয়ার বড় বড় বাণিজ্যিক বাগানে ছাঁটাই করে গাছকে ছোট রাখা হয়। আর বড় বড় ছায়াবীথির নিচে এদের শ্রীবৃদ্ধি। চির সবুজ বৃক্ষ। পাতা একান্তর, ঘন সবুজ ও আয়ত। গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল ফোটে গাছের কাণ্ডে ও ডালে। ফুল ছোট, হালকা গোলাপি ও সাদা। ফলে অনেক শিরা, আকারে অনেকটা নাশপাতি ফলের মতো। পাকা ফলের ভেতরে পেঁপের মতো ফাঁকা আর পাঁচ সারির ছোট ছোট বীজ থাকে।
সব মিলিয়ে প্রায় ৩০টির মতো বীজ থাকে প্রতিটি ফলে। অনেক জাত আছে কোকোয়ার। তাই পাকলে কোনো জাতের ফলের রং হয় মোটো লাল আবার কোনোটার গাঢ় হলুদ। পাকা ফলের ভেতরের বীজ বের করে শুকিয়ে তাকে ফারমেনটেশন বা গাজাতে হয়। তারপর তাকে রোস্ট করে গুঁড়া করতে হয়। এর পাউডার থেকেই চকলেট তৈরি হয়। বছরে দুবার ফল সংগ্রহ করতে হয়। কোকোয়া গাছ শীতল ও গরম হাওয়া কোনোটাই সহ্য করতে পারে না। সে জন্য বড় বড় গাছের সারি দিয়ে কোকোয়ার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়।
এখন কোকোয়ার ভেষজ গুণাবলির কথা বলা যাক। বীজে আছে থিওব্রোমাইন, ক্যাফেন ও রঙিন বস্তু। সার্বিকভাবে বীজ উত্তেজক, মূত্র রোগে উপকারী। থিওব্রোমাইন স্নায়ুবিক রোগের টনিক হিসেবে ব্যবহূত হয়। হূদজনিত রোগে ‘এনজাইমা পেক্টোরিস’-এর ব্যথা উপসম করতে পারে চকলেটের কাত্থ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ও বুকের ব্যথায় চকলেট পানীয় খেতে দেওয়া হতো। ফলের নরম শাঁস থেকে কোকোয়া-মাখন তৈরি হয়। এর প্রলেপ ত্বক কোমল রাখতে সাহায্য করে থাকে।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন